| ছবি: গিরিকণ্ঠ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আজ মঙ্গলবার (৯ জুন ২০২৬) উদ্বোধন হয়েছে দেশের প্রথম স্যাটেলাইটভিত্তিক সমুদ্র গবেষণা কেন্দ্র ‘চীন-বাংলাদেশ ওশান স্যাটেলাইট গ্রাউন্ড স্টেশন ফর মেরিন রিমোট সেন্সিং’ বা ‘স্যাটেলাইট ওশান অবজারভেশন অ্যান্ড ডেটা ইনোভেশন সেন্টার’। বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসা প্রশাসন অনুষদের অডিটোরিয়ামে আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ভূমি মন্ত্রণালয় এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, এমপি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ওশানোগ্রাফি বিভাগের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এই কেন্দ্রটি দেশের সামুদ্রিক গবেষণা, আবহাওয়া বিশ্লেষণ এবং দুর্যোগ পূর্বাভাসে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এটি দেশের প্রথম স্যাটেলাইটভিত্তিক সমুদ্র পর্যবেক্ষণ ও ডেটা সংগ্রহ কেন্দ্র, যার মাধ্যমে রিয়েল-টাইম স্যাটেলাইট তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ সম্ভব হবে। সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রকল্পের সমন্বয়ক ও ডেটা সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ মোসলেম উদ্দিন মুন্না বলেন, বঙ্গোপসাগর নিয়ে উচ্চমানের গবেষণার জন্য এতদিন বাংলাদেশকে বিদেশি স্যাটেলাইটের ওপর নির্ভর করতে হতো। এতে তথ্য পেতে দীর্ঘ সময় লাগার পাশাপাশি সীমিত রেজল্যুশন ও নানা প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা ছিল। নতুন এই কেন্দ্র চালু হলে তথ্য সংগ্রহের সময় ২০ থেকে ৩০ ঘণ্টা থেকে কমে মাত্র ১৫ থেকে ২০ মিনিটে নেমে আসবে। ২০১৯ সালে চীনের জাতীয় সমুদ্র গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেকেন্ড ইনস্টিটিউট অব ওশানোগ্রাফি (এসআইও)-এর সঙ্গে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণা উদ্যোগের মাধ্যমে প্রকল্পটির যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীতে দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয় এবং ২০২৫ সালের মার্চে অবকাঠামো নির্মাণকাজ শুরু হয়। বর্তমানে কেন্দ্রটি ডেটা সংগ্রহের জন্য প্রস্তুত। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, এক্স ও এল ব্যান্ডের স্যাটেলাইট ডেটা রিসিভিং সিস্টেমের মাধ্যমে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও জাপানের বিভিন্ন সমুদ্র ও আবহাওয়া পর্যবেক্ষণকারী স্যাটেলাইট থেকে তথ্য সংগ্রহ করা যাবে। প্রায় ৪২০ টেরাবাইট ডেটা সংরক্ষণ সক্ষমতাসম্পন্ন এই কেন্দ্রটি ভবিষ্যতে মোট ১১টি স্যাটেলাইটের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার লক্ষ্যে কাজ করছে। এই তথ্য ব্যবহার করে মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনা, খাদ্য নিরাপত্তা, ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস, জলবায়ু অভিযোজন, উপকূলীয় বন্যা মডেলিং এবং সুনীল অর্থনীতি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গবেষণা ও পরিকল্পনা গ্রহণ সহজ হবে বলে জানিয়েছেন গবেষকরা। এছাড়া সমুদ্রে মাছের সম্ভাব্য অবস্থান নির্ধারণ, নদীভাঙন, বন উজাড় এবং জলবায়ু পরিবর্তন বিশ্লেষণেও এই কেন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তথ্য নিরাপত্তা প্রসঙ্গে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলেন, এটি সম্পূর্ণ বেসামরিক ও গবেষণাভিত্তিক উদ্যোগ। কেন্দ্রটিতে কোনো আপলিংক সুবিধা নেই; এটি শুধুমাত্র ডাউনলিংক গ্রাউন্ড স্টেশন হিসেবে কাজ করবে। ব্যবহৃত ফ্রিকোয়েন্সিও বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) অনুমোদিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আল ফোরকান বলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতা সম্প্রসারণ করা হবে। তিনি জানান, প্রকল্পটিতে কোনো সরাসরি আর্থিক লেনদেনভিত্তিক চুক্তি হয়নি। অংশীদার প্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় ৫০ কোটি টাকা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত সহায়তার আনুমানিক মূল্য ২০ কোটি টাকার বেশি হতে পারে। কেন্দ্রটির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে সমুদ্রে বয়া স্থাপন, গবেষকদের জন্য উন্মুক্ত ডেটা পোর্টাল চালু, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক পূর্বাভাস মডেল তৈরি এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বিত গবেষণা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা।