বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তবর্তী বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়নে মাইন বিস্ফোরণে প্রাণহানির ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়ে চলেছে। সর্বশেষ সোমবার (৯ জুন) সকালে রেজু আমতলী সীমান্ত এলাকায় মাইন বিস্ফোরণে নিহত হয়েছেন আব্দুল খালেক (৩০) নামে এক রোহিঙ্গা শ্রমিক। এ নিয়ে মাত্র ১৬ দিনের ব্যবধানে একই সীমান্ত এলাকায় মাইন বিস্ফোরণে প্রাণ হারালেন পাঁচজন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসবাসকারী আব্দুল খালেক স্থানীয় শ্রমিকদের সঙ্গে সীমান্তঘেঁষা একটি পাহাড়ি কলাবাগানে কাজ করছিলেন। সকালে কাজের একপর্যায়ে হঠাৎ বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। এতে তার দুই পা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সহকর্মীরা ঝুঁকি নিয়ে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিলেও শেষ পর্যন্ত চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।
ঘটনাস্থলটি ঘুমধুম ইউনিয়নের রেজু আমতলী সীমান্তের ৩৯ ও ৪০ নম্বর পিলারের মধ্যবর্তী এলাকা। স্থানীয়দের ধারণা, সেখানে আগে থেকেই অ্যান্টি-পার্সোনেল মাইন পুঁতে রাখা ছিল।
এর আগে গত ২৪ মে তুমব্রু সীমান্তের ৪১ ও ৪২ নম্বর পিলারের মাঝামাঝি এলাকায় মাইন বিস্ফোরণে একসঙ্গে নিহত হন তিন পাহাড়ি শ্রমিক—অক্যমং তংচঙ্গ্যা (৪০), চিক্যং তংচঙ্গ্যা (৩৪) ও শৈফুচিং তংচঙ্গ্যা (৩২)। প্রথম বিস্ফোরণে একজন নিহত হওয়ার পর তাকে উদ্ধার করতে গিয়ে আরও দুইজন দ্বিতীয় বিস্ফোরণের শিকার হন।
স্থানীয় ইউপি সদস্য অংসাই মারমা বলেন, “একজনকে বাঁচাতে গিয়ে আরও দুইজন প্রাণ হারিয়েছেন। তিনটি পরিবার একসঙ্গে তাদের উপার্জনক্ষম সদস্যদের হারিয়েছে।”
স্থানীয় প্রশাসন, বিজিবি ও সীমান্তবাসীর তথ্যমতে, ২০২৪ সালের শেষ দিক থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে মাইন ও অবিস্ফোরিত গোলার বিস্ফোরণে অন্তত ১০ জন নিহত এবং ৪০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বাংলাদেশি কৃষক, পাহাড়ি শ্রমিক, রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং বিজিবি সদস্যও রয়েছেন।
মাইন বিস্ফোরণে আহতদের অনেকেই স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। প্রায় তিন বছর আগে মাইন বিস্ফোরণে একটি পা হারানো অং না থিং বর্তমানে ছোট একটি দোকান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তিনি বলেন, “অনেকেই সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কিন্তু হারানো পা কেউ ফিরিয়ে দিতে পারবে না।”
সীমান্ত এলাকায় মাইন অপসারণ ও নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। সম্প্রতি এলাকা পরিদর্শন করে এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব এস এম সুজা উদ্দিন বলেন, “সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষ নীরব মানবিক সংকটের মধ্যে বসবাস করছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিতকরণ, মাইন অপসারণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।”
নাইক্ষ্যংছড়ির স্থানীয় সাংবাদিক মাহমুদুল হাসান বলেন, “সীমান্তে মাইন অপসারণে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। নিরাপদ ভূখণ্ড ও নিরাপদ জীবন সীমান্তবাসীর ন্যায্য অধিকার।”
এদিকে ৩৪ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এস এম খায়রুল আলম জানিয়েছেন, সীমান্তের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাব বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে পড়ছে। সংঘাতের কারণে সীমান্তের বিভিন্ন পাহাড়ি অঞ্চলে মাইন পুঁতে রাখা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।